আন্তর্জাতিক

সস্তা ড্রোন বনাম দামি ক্ষেপণাস্ত্র: ইরান যুদ্ধে জয়ের চাবিকাঠি এখন খরচের হিসাব

এতে প্রতিরক্ষার খরচ অনেক দ্রুত বাড়ছে এবং দীর্ঘ যুদ্ধ হলে এটি বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, কম দামের ড্রোন আর খুব ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের খরচের পার্থক্যই এই যুদ্ধে কে এগিয়ে থাকবে তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

 
ইরানের পবিত্র শহর কম–এর কাছে একটি সড়কে দ্রুতগতিতে চলছিল একটি ট্রাক, যার ভেতরে ছিল এক প্রাণঘাতী অস্ত্র। একটি ঝাপসা সাদা-কালো ভিডিওতে দেখা যায়, ট্রাকটি ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানায়।
 
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ক্ষেপণাস্ত্রটি ট্রাকটিতে আঘাত হানছে এবং বিস্ফোরণের পর সেখান থেকে ধোয়া উড়ছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করে, ট্রাকটিতে একটি লঞ্চার তথা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক ‘হামলার জন্য প্রস্তুতি’ নিচ্ছিল। গত বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) তারা সামাজিক মাধ্যমে এর ধ্বংসের ভিডিও প্রকাশ করে।
 
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র বলছে, যুদ্ধ শুরুর প্রথম সপ্তাহেই তারা ইরানের ৩০০–এর বেশি লঞ্চার ধ্বংস করেছে। তাদের মতে, এই অভিযানের ফলে ইরানের পাল্টা হামলার সক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, ইরান হয়তো এখনই তাদের আরও উন্নত অস্ত্র ব্যবহার করছে না এবং পরবর্তী সময়ের জন্য সেগুলো সংরক্ষণ করে রাখছে।
 
 
এই যুদ্ধে শুধু ক্ষেপণাস্ত্রই নয়, ড্রোনও বড় ভূমিকা রাখছে। ইসরাইলি ও মার্কিন আগ্রাসনের জবাবে উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরান ঝাঁকে ঝাঁক ড্রোন ব্যবহার করছে, যার লক্ষ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা।
 
আর এখানেই অর্থ ও উপাদানে একটি বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। ইরানের একটি ড্রোনের দাম প্রায় ২০ হাজার ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় মাত্র ২৪ লাখ টাকা) হলেও এগুলো ভূপাতিত করতে যে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলোর প্রতিটির দাম প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ কোটি টাকা।
 
এ কারণে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও গালফ তথা উপসাগরীয় দেশগুলোর মজুদে থাকা এই ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর শেষ হয়ে যেতে পারে, যখন ইরানের কাছে এখনও অনেক ড্রোন অবশিষ্ট থাকবে।
 
চলতি সপ্তাহে বিশ্লেষক আমোস ফক্স ও ফ্রান্জ-স্টেফান গ্যাডি ফরেন পলিসি-তে লিখেছেন, ‘হামলাকারীরা (যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল) এমন এক দীর্ঘ ক্ষয়যুদ্ধে জড়াতে চায় না যেখানে প্রতিদিন শত শত মিলিয়ন ডলার খরচ হবে এবং অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে যাবে। তাদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে হারার বদলে যদি প্রতিরক্ষা অস্ত্রই শেষ হয়ে যায়, তাহলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’
 
যুদ্ধ শুরুর সময় ইরানের কাছে প্রায় ২০০০ থেকে ২৫০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছিল বলে ধারণা করেছিল ইসরাইল। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক ইব্রাহিম জালালের মতে, গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) থেকে এখন পর্যন্ত ইরান ইসরাইল ও গালফ অঞ্চলের দিকে ৮০০-র বেশি ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ১৬০০ ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।
 
এদিকে গালফ দেশগুলো ইরানি হামলা ঠেকাতে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্র তেকে নতুন ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানোর অপেক্ষায় রয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান ব্রাড কুপার জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ কমেছে এবং ড্রোন হামলা কমেছে প্রায় ৮৩ শতাংশ।
 
উদাহরণ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কথা বলা যায়। যুদ্ধের প্রথম দিনে দেশটির দিকে ১৩৭টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার সেই সংখ্যা নেমে আসে মাত্র সাতটিতে। একইভাবে ড্রোন হামলাও ২০৯ থেকে কমে ১৩১-এ নেমেছে।
 
তবে বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আকাশেই প্রতিহত করা হলেও ধ্বংসাবশেষ পড়ে ভবন ও অবকাঠামোর কিছু ক্ষতি হচ্ছে। বড় ধরনের প্রাণহানি সাধারণত তখনই হয় যখন কোনো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে। যেমন জেরুজালেমের কাছে একটি সিনাগগে হামলায় নয়জন নিহত হন। অন্যদিকে তীব্র হামলার পরও সংযুক্ত আরব আমিরাতে এখন পর্যন্ত মাত্র তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button