জ্বালানির মজুত শেষ হলে কী করবে বাংলাদেশ?

ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটেছে। যুদ্ধ শুরুর পরই ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের ওই ঘোষণার পর নৌরুটে চলাচলাকরী সব নৌযানে ওই বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর পরই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু-হু করে বাড়তে শুরু করে। বাংলাদেশের পরিশোধিত জ্বালানি তেলের সিংহভাগ আসে পারস্য উপসাগরীয় এই পথেই। পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে ১৪ দিনের জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে। যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি নজরে রেখে তেলের বিকল্প বাজার খোঁজার বিষয়ে ভাবা হচ্ছে।
এদিকে ইরান সতর্কবার্তা দেওয়ার পর অন্তত ১৫০টি তেলবাহী ট্যাংকার প্রণালির বাইরে নোঙর করেছে। এরমধ্যে বাংলাদেশেরও একটি ট্যাংকার রয়েছে বলে জানিয়েছে জাহাজ চলাচল বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি ঘাটতি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য সমন্বয়ের চাপÑএই তিন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ।
এদিকে ইরানের ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো তাদের বৃহত্তম শোধনাগার রাস তানুরা শোধনাগার সতর্কতামূলকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। এই শোধনাগার থেকেই বছরে সাত থেকে আট লাখ টন অপরিশোধিত অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড আমদানি করে বিপিসি। পরে তা চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে পরিশোধিত হয়ে দেশের বাজারে সরবরাহ হয়। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী মার্চের শুরুতে এক লাখ টন তেল লোড হওয়ার কথা থাকলেও তা বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্র জানায়, দেশের জ্বালানি তেলের প্রায় শতভাগই আমদানিনির্ভর। অপরিশোধিত তেলের পুরোটা আসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। অপরদিকে গ্যাসের মোট চাহিদার প্রায় ৩৫ শতাংশ পূরণ হয় আমদানি করা এলএনজি দিয়ে, যার বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর।
বিশ্ববাজারে এরই মধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তা ১০০ ডলার ছাড়াতে পারে। এলএনজির দামও ২০-২৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থান আমদানি ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, জ্বালানি আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত অবস্থায় হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে। বাকি প্রায় ৮০ শতাংশ পরিশোধিত তেল চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা হয়, যেখানে হরমুজের ওপর নির্ভরতা নেই। ফলে তাৎক্ষণিক বড় সংকট না থাকলেও অপরিশোধিত তেল সরবরাহে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুত রয়েছে প্রায় ২ লাখ ১৭ হাজার টন, যা দিয়ে দুই সপ্তাহের মতো চলা সম্ভব। পেট্রল, অকটেন ও ফার্নেস তেলেরও কয়েক সপ্তাহ থেকে দুই মাসের মজুত আছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি চালান বিলম্বিত হলে কৃষি, পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে চলমান বোরো মৌসুম ও গ্রীষ্মকালীন বিদ্যুৎ চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে।
গ্যাস খাতেও উদ্বেগ বাড়ছে। দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ হচ্ছে ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে প্রায় ৯৫ কোটি ঘনফুট আসে এলএনজি থেকে। রাষ্ট্রীয় সংস্থা পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, এ বছর ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছেÑএর মধ্যে কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় উল্লেখযোগ্য অংশ আসার কথা। তবে কাতার থেকে সরবরাহও হরমুজ প্রণালিনির্ভর হওয়ায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এলএনজি বা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারে কাতার বড় সরবরাহকারী। বৈশ্বিক রপ্তানি বৈশ্বিক বাজারের প্রায় ২০ শতাংশ তারাই সরবরাহ করে। এই পরিস্থিতিতে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং দাম বেড়েছে।
আল জাজিরার সংবাদে বলা হয়েছে, চীন বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিকারক হলেও তাদের আমদানির বড় অংশ আসে অস্ট্রেলিয়া থেকে। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩৪ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস আসে অস্ট্রেলিয়া থেকে।
যদিও দেশে জ্বালানি তেলের সংকট নেই বলে দাবি করেছে বিপিসি। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পর্যাপ্ত জ্বালানি নিয়ে উদ্বেগ শিল্প উদ্যোক্তাদের। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি হতে পারে ১০০ ডলার, যা এখন ৭৮ ডলার। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, এর বাণিজ্যিক প্রভাবও তত বাড়বে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় প্রভাব পড়বে আমদানি রপ্তানি বাণিজ্য ও জ্বালানি তেলের দামে। কেননা, দেশের ৮০ শতাংশ জ্বালানি তেলের চাহিদা মেটায় মধ্যপ্রাচ্য। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বে প্রতিদিন পরিবহন হয় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল, যা বিশ্ব বাণিজ্যের ২১ শতাংশ।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন উৎপাদন খরচ নিয়েও। এর যদি জ্বালানি সংকট যদি দেখা দেয়, তাহলে কিন্তু এটা বড় ধরনের ডিজাস্টার হবে। যদি অল্টারনেটিভ ব্যবস্থা নেয়, তাহলে হয়তো এটার সমাধান হতে পারে, বাট অল্টারনেটিভ ব্যবস্থা এত সহসা নিতে পারবে কি না, এটা একটা শঙ্কার বিষয়।
তবে বিপিসির দাবি, যুদ্ধ পরিস্থিতি নজরে রেখে তেলের বিকল্প বাজার খোঁজার বিষয়ে ভাবছে সরকার। এছাড়া দাম বাড়ার সংখ্যা নেই বলেও জানান সংস্থাটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রেজানুর রহমান।
তিনি বলেন, যেকোনো ধরনের ফুয়েলের ক্ষেত্রে ১৪ দিনের চেয়ে বেশি রিজার্ভ আমাদের আছে, রিফাইনড অয়েলের যে ব্যাপারটা সেটা আমাদের তো জানুয়ারি টু জুন আমাদের চুক্তি কমপ্লিট।
বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি নজরে রেখে তেলের বিকল্প বাজার খোঁজার বিষয়ে ভাবা হচ্ছে। তবে বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ মজুত রয়েছে, তাতে দাম বাড়ার শঙ্কা নেই।
দ্রুতই তেলের মজুত বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি তেলের ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি মূল্য ১০ ডলারের মত পার ব্যারেলে বেড়ে গেছে। এটা ৮০ ডলারের কাছে চলে গেছে। এটা ১০০ ডলারে চলে যেতে পারে বলে জানান তিনি।