ভোটের কেন্দ্রভিত্তিক ফল প্রকাশ, পোস্টাল ব্যালটে জয়-পরাজয় কোথায়

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ২৯৭ আসনের কেন্দ্রভিত্তিক ফল প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন।
বুধবার ইসির ওয়েবসাইটে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব ফল প্রকাশ করা হয়।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২০৯টি আসন পেয়ে ইতোমধ্যে সরকার গঠন করেছে। জামায়াত ৬৮টি আসন পেয়ে বিরোধী দলে রয়েছে। এবার অর্ধশত দল ভোটে অংশ নিলেও সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছে ৯টি দল আর স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
এবার সংসদ নির্বাচনের দিনে একসঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
কে কত ভোট পেল
| দল | জয়-প্রতিদ্বন্দ্বিতা | ভোট (প্রায়) |
| বিএনপি | ২০৯ আসনে জয়, ২৯০টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা | ৩,৭৪,৬৮,৯৯৪ |
| গণসংহতি আন্দোলন | ১ আসনে জয়, ১৭টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা | ১,০৪,৮১২ |
| বিজেপি | ১ আসনে জয়, ২টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা | ১,০৫,৭৭৯ |
| গণঅধিকার পরিষদ | ১ আসনে জয়, ৯৪টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা | ২,৪৩,৫১১ |
| স্বতন্ত্র | ৭ আসনে জয়, ২৭৪টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা | ৪৩,৩৯,২৩৮ |
| জামায়াত | ৬৮ আসনে জয়, ২২৭টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা | ২,৩৮,২৫,২৫৯ |
| এনসিপি | ৬ আসনে জয়, ৩২টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা | ২২,৮৬,৭৯৫ |
| বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ | ২ আসনে জয়, ৩৪টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা | ১৫,৬৪,১৮৭ |
| খেলাফত মজলিশ | ১ আসনে জয়, ২০টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা | ৫,৬৯,৭৩০ |
| ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ | ১ আসনে জয়, ২৫৭টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা | ২০,২৪,১৪০ |
সংসদে বাতিল ভোট প্রায় ১৭ লাখ
সংসদ নির্বাচনে পৌনে ১৩ কোটি ভোটারের মধ্যে এবার ভোট দিয়েছেন ৭ কোটি ৬৬ লাখ ৮১ হাজার ১৯৩ জন; যা ৬০ দশমিক ২৪ শতাংশ। এরমধ্যে ভোট বাতিল হয়েছে ১৬ লাখ ৯১ হাজার ৮০টি। যেসব আসনে ভোট বাতিল হয় সেগুলোতে মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭২ লাখ ৯৮ হাজার ৫৮৫ জন।
এবার গণভোটে মোট বৈধ ভোটের সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৯১ লাখ ৮৬ হাজার ২১১টি। আর বাতিল হয়েছে ৭৪ লাখ ৩৫ হাজার ১৯৬টি ভোট।
পোস্টাল ব্যালটে জয়-পরাজয়ে প্রভাব
এবার সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রবাসে এবং দেশের ভেতরে পোস্টাল ব্যালটে ভোট হয়েছে।
৩০০ আসনে দেশে ও প্রবাসে ১৫ লাখ ২০ হাজার ৯৩ জন ভোট দিয়েছেন। এরমধ্যে বাতিল ভোট রয়েছে ৫৭ হাজার ৮৯৮টি। আর
১০ লাখ ৬৩ হাজার ৮৭৪টি ভোট রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পৌঁছেছে। সে হিসাবে প্রদত্ত ভোটের হার ৬৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
প্রতিটি আসনে পোস্টাল ব্যালটের ভোট গণনার জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে আলাদা একটি ভোটকেন্দ্র রাখা হয়। সংশ্লিষ্ট আসনের অন্য সবকেন্দ্রের ফলের সঙ্গে এ কেন্দ্রের ফল যোগ করে চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করা হয়।
নির্বাচন কর্মকর্তারা বলেন, পোস্টাল ব্যালটের অধিকাংশ কেন্দ্রে বিএনপির চেয়ে এগিয়ে ছিল জামায়াত, এনসিপি ও তাদের জোটের প্রার্থীরা। তবে দুটি আসনে পোস্টাল ব্যালটের ভোটেই জয়-পরাজয় নির্ধারিত রয়েছে।
মাদারীপুর-১ আসনে ৩৮৫ এবং সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে ৫৯৪ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন দুই প্রার্থী।
মাদারীপুর-১ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের প্রার্থী জয় পেয়েছেন ৬৪,৯০৯ ভোটে। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থীর ভোট ছিল ৬৪,৫২৪টি। এ আসনে পোস্টাল ব্যালটের ভোট ব্যবধান গড়েছে বলে আলোচনা রয়েছে।
খেলাফত মজলিশের প্রার্থী পোস্টাল ব্যালটে ভোট পান ১,৩৯৮টি এবং বিএনপি প্রার্থী পান ২৩৩ ভোট।
সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী জিতেছেন ১,৬১,৮৭২ ভোট পেয়ে; বিএনপি প্রার্থী পান ১,৬১,২৭৮ ভোট। এখানে জামায়াত প্রার্থী পোস্টাল ব্যালটে ভোট পান ২১৭৯ আর ধানের শীষ প্রার্থী পান ৮২০ ভোট।
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেন, “পোস্টাল ব্যালটের ভোট এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এবারের ফলাফল আগামী রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে প্রচারে ও নিজেদের বিষয়ে আরও সচেতনতা বাড়াবে।
“সেই সঙ্গে পোস্টাল ব্যালটে এতে ভোট দেওয়ার পরও কেন সময়মত রিটার্নিং অফিসারের কাছে পৌঁছালো না, কোথায় কোথায় ঘাটতি ছিল-সব মিলিয়ে এবারের অভিজ্ঞতা থেকে আগামীর জন্য নতুন করে পদক্ষেপ নিতে হবে ইসিকেও।”
ভোটের হারে শীর্ষে চুয়াডাঙ্গা-২, সর্বনিম্নে ঢাকা-১২
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ৭৮.২৭% ভোট পড়েছে চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে। আর সর্বনিম্ন ঢাকা-১২ আসনে সর্বনিম্ন ৩৭.৪২% ভোট পড়ে, যেখানে সর্বোচ্চ ১৫ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিল।
অপরদিকে পাঁচ ভাগের এক ভাগ আসনে ৭০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে।
আসনগুলো হল- পঞ্চগড়-১, পঞ্চগড়-২, ঠাকুরগাঁও-১, ঠাকুরগাঁও-২, ঠাকুরগাঁও-৩, দিনাজপুর-১, দিনাজপুর-২, দিনাজপুর-৪, দিনাজপুর-৫, দিনাজপুর-৬, নীলফামারী-২, নীলফামারী-৩, লালমনিরহাট-১, জয়পুরহাট-১, জয়পুরহাট-২,বগুড়া-২, বগুড়া-৩, বগুড়া-৪, বগুড়া-৫, বগুড়া-৬, বগুড়া-৭, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২, নওগাঁ-১, নওগাঁ-২, নওগাঁ-৩, নওগাঁ-৪, রাজশাহী-১, রাজশাহী-৩, রাজশাহী-৪, রাজশাহী-৬, নাটোর-১, নাটোর-২, নাটোর-৩, নাটোর-৪, সিরাজগঞ্জ-৪, পাবনা-১, পাবনা-৩, পাবনা-৪, মেহেরপুর-১, কুষ্টিয়া-২, কুষ্টিয়া-৩ , কুষ্টিয়া-৪, চুয়াডাঙ্গা-১, চুয়াডাঙ্গা-২, ঝিনাইদহ-১, ঝিনাইদহ-২, ঝিনাইদহ-৩, ঝিনাইদহ-৪, যশোর-১, যশোর-২, যশোর-৪, যশোর-৫, যশোর-৬, বাগেরহাট-২, বাগেরহাট-৩, খুলনা-৫, সাতক্ষীরা-১, সাতক্ষীরা-২, সাতক্ষীরা-৩।
জামানত গেছে ১৩৪৭ জনের, পৌনে ৭ কোটি টাকা আয়
৫০টি দলের ও স্বতন্ত্র মিলে ভোটে প্রার্থী ছিলেন ২০২৮ জন। এরমধ্যে ১৩৪৭ জন প্রার্থী জামানত হারিয়েছেন।
এবার প্রার্থীদের জামানত ছিল ৫০ হাজার টাকা।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ১৩৪৭ জন (৬৬% প্রতিদ্বন্দ্বী) প্রায় পৌনে সাত কোটি টাকার জামানত খুঁইয়েছেন বলে জানান ইসি কর্মকর্তারা।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ১,৪৫৪ জন জামানত হারিয়েছিলেন। সেবার জামানতের টাকা ছিল ২০ হাজার।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ (১২.৫ শতাংশ) ভোট না পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।
ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার কর্মকর্তারা বলেন, মাঠ পর্যায় থেকে জামানত বাজেয়াপ্তের তথ্যাবলী আসছে, দলভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তথ্য পেতে আরেকটু সময় লাগবে। হারানো জামানতের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয়ে থাকে।
অপরদিকে পৌনে ৭০০ জনের মত প্রার্থী যারা জামানতের অর্থ রক্ষা করতে পেরেছেন তারা চাইলে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে গিয়ে জামানতের অর্থ ফেরতের আবেদন করে টাকা তুলে নিতে পারব্নে।
ইসির জনসংযোগ পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিক বলেন, ভোটের ফলের গেজেট প্রকাশের পর আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে পারে সংক্ষুব্ধ যে কেউ। এজন্য ৪৫ দিন সময় রয়েছে। এ সময়সীমা পার হওয়ার পরই জামানতের অর্থ ফেরতের যোগ্যরা আবেদন করতে পারেন।
তিনি বলেন, যারা অর্থ উত্তোলন করবেন না তাদের টাকা সরকারের নির্ধারিত যে কোডে জমা নেওয়া হয়েছিল সেখানে জমা থাকবে। যাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হবে তা কোষাগারে জমা হবে।