মহান শিক্ষিকা মাহরীন চৌধুরীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে না পারায় মানবতা কী হেরে গেল?

ঢাকা উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুলে প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনা কেবল একটি প্রাকৃতিক বা কারিগরি বিপর্যয় নয়, এটি আমাদেরকে জাতিগত বিবেক ও মানবিকতা নিয়ে এক গভীর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। ভয়াবহ আগুন আর বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত ভবনে যখন মৃত্যু ও বিভীষিকা ছড়িয়ে পড়ে, তখন জীবনের সবচেয়ে নির্মম পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ কী করতে পারেন তার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন শিক্ষিকা মাহরীন চৌধুরী।
একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে যখন সেই স্কুলের ভবনে ধসে পড়ে, তখন মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে আগুনের লেলিহান শিখা। আতঙ্কগ্রস্ত শিশু শিক্ষার্থীরা চিৎকার আর কান্নায় ভেঙে পড়ে। সেই ভয়াল মুহূর্তে স্বভাবতই মানুষ নিজের প্রাণ বাঁচাতে ব্যাকুল হয়ে পড়ে। আর তখন মাহরীন চৌধুরী নিশ্চিত মৃত্যুকে উপেক্ষা করে নিজের শ্রেণিকক্ষ থেকে একে একে ২০ জনেরও বেশি খুদে শিক্ষার্থীকে আগুন থেকে বের করে আনেন। তিনি বারবার কক্ষের ভেতরে ঢুকে আগুনের মুখে গিয়ে সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের বাঁচিয়ে আনেন। একসময় সেই আগুন আর বিস্ফোরণ তাকে গ্রাস করে ফেলে।
স্বামীর সঙ্গে শেষ কথা: প্রায় শতভাগ দগ্ধ মাহরীন চৌধুরীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেয়া হয়। তবে চিরবিদায়ে আগে হয়তো প্রিয়তম স্বামী মনছুর হেলালের সঙ্গে শেষ কথা বলার জন্য বেঁচে ছিলেন এই সাহসী শিক্ষিকা।
মনছুর হেলাল বলেন, ‘বাচ্চারা যেদিক দিয়ে বের হবে, ওখানে সরাসরি এসে বিমানটি ক্রাশ করছে, তারপরে এক্সপ্লোশন হয়ে ভেতরে ঢুকে গেছে। ঘটনার পর মাহরিন কিছু বাচ্চাকে বের করে নিয়ে আসে।’
আইসিউতে মাহরীনের শেষ কথা প্রসঙ্গে মঙ্গলবার (২২ জুলাই) সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপকালে মনছুর হেলাল বলেন, ‘আইসিইউতে আমি তাকে বললাম, তুমি কেন এ কাজ করতে গেলা? সে বলল, আমার বাচ্চারা আমার সামনে সব পুড়ে মারা যাচ্ছে, আমি এটা কীভাবে সহ্য করি। ও (মাহরীন) সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে, কিছু বাচ্চা বের করছে, আরও কিছু বাচ্চা বের করার চেষ্টায় ছিল। ঠিক এমন সময় বিকট শব্দে আরেকটি বিস্ফোরণ হয়। আর তাতেই তার পুরো শরীর পুড়ে যায়।’
মনছুর হেলাল আরও বলেন, ‘লাইফ সাপোর্টে নেয়ার আগে বলল, আমার ডান হাতটা শক্ত করে ধরো। হাত ধরা যায় না, সব পুড়ে শেষ। ও বলল, তোমার সঙ্গে আর দেখা হবে না।’
স্বামীর হাত ধরে মাহরীন তখন বলছিলেন, ‘আমার বাচ্চাদের দেখো।’ জবাবে মনছুর হেলাল বলেন, ‘তোমার বাচ্চাদের এতিম করে গেলা। জবাবে সে বলে, কী করব, ওরাও তো আমার বাচ্চা, সবাই পুড়ে মারা যাচ্ছে, আমি কীভাবে সহ্য করবো?’ আর এভাবে প্রিয়তম স্বামীর কাছে থেকে শান্তভাবে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন মাহরীন চৌধুরী। তিনি মৃত্যুর কাছে হার মানলেও মানবতাকে জিতিয়ে দিয়েছেন।
এই দুর্ঘটনায় যুদ্ধবিমানের প্রশিক্ষণার্থী পাইলটও নিহত হয়েছেন এবং তাকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে। তা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও প্রোটোকলের অংশ। কিন্তু একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরে ফিরে আসছে- একজন পেশাগত দায়িত্ব পালনকারী (এবং অনেকের মতে দায়িত্বহীনতা, ভুল সিদ্ধান্ত বা বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটি শিকার) সেই পাইলট যদি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেতে পারেন, তাহলে বেসরকারি স্কুলের সেই শিক্ষিকা যিনি নিঃস্বার্থভাবে জীবন দিয়ে শিশুদের বাঁচালেন, তিনি কেন পাননি রাষ্ট্রীয় সম্মান?
এই প্রশ্ন এখন শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই নয়, উচ্চ পর্যায়ের রাজনীতিবিদ, বিশিষ্ট নাগরিক, মানবাধিকার কর্মী এবং দেশের সাধারণ মানুষদের মুখে মুখে। একজন আত্মত্যাগী নারী, একজন শিক্ষক, একজন মানবতাবাদী সাহসী মানুষ- যিনি নিজের জীবনের মায়াকে তুচ্ছ করে শিশুদের জীবন বাঁচালেন, তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান না জানানো বৈষম্যহীন বাংলাদেশ নির্মাণে কী আমার পিছিয়ে গেলাম। আমারা জাতি হিসেবে কতটা উদারতা, কতটা ন্যায্যতা দেখাতে পেরেছি, সেই আয়নায় নিজেদের দেখে নেয়ার সময় এসেছে।
দুর্ঘটনাটি নিঃসন্দেহে অনিচ্ছাকৃত, কিন্তু অনেকে আবেগআপ্লুত হয়ে অভিযোগ করছেন যুদ্ধবিমানটি কেন জনবহুল একটি স্কুল এলাকায় বিধ্বস্ত হলো? প্রশিক্ষণকালে যদি ত্রুটি ধরা পড়ে, তবে জনাকীর্ণ অঞ্চল এড়িয়ে ফেলার প্রশিক্ষণ কী দেয়া হয়নি? পাইলট কি চাইলেই বিমানটিকে খালি কোনো স্থানে নামাতে পারতেন না? এই প্রশ্নগুলো আপাত অমানবিক মনে হলেও, দুই শিক্ষকসহ ৩০ জনের বেশি নিস্পাপ শিশুর প্রাণহানি এবং বহু দগ্ধ শিশুর কাতরতা এ প্রশ্নগুলোকে নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের খাতিরেই জিজ্ঞাসিত করেছে।
তাছাড়া এমন পুরোনো মডেলের যুদ্ধবিমান দিয়ে প্রশিক্ষণ চালানোর যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই বলছেন, এর মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে, যা শেষমেশ শিশু শিক্ষার্থীদের প্রাণ নিয়ে গেল। আর সন্তানহারা বাবা-মাকে অসহনীয় বিরহ আর অনন্ত বেদনার মাঝে ফেলে দিলো।
অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদা কেবল সরকারী পদের কারণে নয়, মানবিক কৃতিত্বের জন্যও দেয়া হতে পারে এবং হওয়া উচিত। মাহরীন চৌধুরীর দৃষ্টান্ত তেমনই এক শক্তিশালী উদাহরণ হতে পারে। যদি কোনো ব্যক্তি শুধু তার দৃঢ় মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের কারণে নিজেকে বিলিয়ে দেন, তাহলে তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানানো রাষ্ট্রের কর্তব্যে পরিণত হয়। এবং যখন দেখা যায় সেই শিক্ষিকার শেষকৃত্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সম্পন্ন হয়নি, তখন সেটা শুধু দায়িত্বহীনতা নয় সেটা মানবতার ধারকের ওপর রাষ্ট্রীয় স্তরে অবহেলার প্রতিচ্ছবি।
যদি মাহরীন চৌধুরীর মতো একজন মহান ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান না জানানো হয়, তাহলে তা ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে কী বার্তা রেখে যাবে? রাষ্ট্রীয় সম্মাননা শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি সমাজের মূল্যবোধকে সংজ্ঞায়িত করে। মাহরীন চৌধুরীর মৃত্যু এক অপূরণীয় ক্ষতি, কিন্তু তার আত্মত্যাগ একটি অনন্য উদাহরণ- যা শুধু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিদার নয়, জাতীয় পাঠ্যপুস্তকেও স্থান পাওয়ার যোগ্য।অনেকের আশা তাকে দ্রুত সম্মান জানিয়ে রাষ্ট্র তার ভুল শুধরে নিবে। মানবতা তখনই হারবে, যদি মাহরীন চৌধুরীর সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ আমাদের নীতিনির্ধারকদের হৃদয় স্পর্শ না করে।