সরকারের ঢিলেমির কারণেই খুনীরা মাথাচাড়া দিচ্ছে: জোনায়েদ সাকি

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, তারা তা রাখতে পারছে না। তাদের সমস্ত কার্যক্রম ঢিলেঢালাভাবে চলছে, যার সুযোগ নিয়ে এখন খুনীরা মাথাচাড়া দিচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানের সরকারের দায়িত্ব ছিল জনগণকে ঐক্যবদ্ধ রেখে জনপ্রত্যাশা পূরণে কাজ করা।
বুধবার (১৬ জুলাই) শহীদ আবু সাঈদের প্রথম শাহাদাতবার্ষিকীতে শহীদ স্মরণে সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি।
‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষায় নতুন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বন্দোবস্তের মাধ্যমে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরে ঐক্যবদ্ধ হোন’- এই আহ্বানে রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে আয়োজিত সমাবেশে জোনায়েদ সাকি বলেন, শহীদ পরিবার ও আহতদের ন্যায়বিচারের দাবি পূরণ হচ্ছে না, এর দায় সরকারের। প্রয়োজনে আরও ট্রাইবুন্যাল গঠন করেন, কিন্তু বিচারকে আরও দৃশ্যমান ও তরান্বিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, যারা ক্ষমতায় যাবে তারা জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে এটা নিশ্চিত করার জন্য আমাদেরকে সংস্কার করতে হবে। ক্ষমতাকে জবাবদিহি করানোর জন্য ক্ষমতার ভারসাম্য করতে হবে। যে সংস্কার না হলে এদেশে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য তৈরি হবে না, ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে না- সে সংস্কার অবশ্যই লাগবে। ৫ আগস্টের মধ্যে অবশ্যই জুলাই সনদ হতে হবে। যেসব সংস্কারের প্রস্তাবে সকলের ঐকমত্য হবে সেগুলো বাস্তবায়িত হবে, যেগুলোতে ঐকমত্য হবে না, সেগুলো নিয়ে জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবে। আমাদেরকে বিচার করতে হবে, সংস্কার করতে হবে, নির্বাচন করতে হবে। তিনটাই খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্তরণ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে যাওয়া এখন অপরিহার্য।
তিনি বলেন, বিচার আর সংস্কার আগে হবে কিন্তু নির্বাচন আগে হবে না- এটা যারা বলেন, তাদের জানা দরকার, নির্বাচন ছাড়া সংস্কার টেকসই হবে না। জনগণের সম্মতি হলো নির্বাচন, আর জনগণের সম্মতি ছাড়া সংবিধান সংস্কার করা যাবে না।
এনসিপির জুলাই পদযাত্রার কর্মসূচিতে হামলার নিন্দা জানিয়ে জোনায়েদ সাকি বলেন, পতিত ফ্যাসিস্টরা এখনও তাদের পেশীশক্তি দেখিয়ে যাচ্ছে, পুলিশ নিরাপত্তা দিতে পারছে না। মব সন্ত্রাস বাড়ছে, জনগণ নিরাপত্তা পাচ্ছে না, সরকারের ঢিলেঢালা ভাবের কারণে এখন ফ্যাসিস্টরাও আবার মাথাচাড়া দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
জোনায়েদ সাকি বলেন, আগামীর বাংলাদেশে আমরা লুটের টাকা ফেরত আনতে চাই। সারা বাংলাদেশের মানুষের শিক্ষা-স্বাস্থ্যের উন্নতি করে মানুষের জীবনমানের উন্নতি করতে চাই। আগামী দিনে দরকার গণমানুষের সরকার। শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি মানুষের ভাগ্য বদল করবে কারা, তরুণদের জীবনের পরিবর্তন আনবে কারা- সেই সিদ্ধান্ত জনগণকে নির্বাচনের মাধ্যমেই নিতে হবে। জনগণ যদি ক্ষমতার ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে তাহলে আবার সেই ফ্যাসিস্ট হওয়ার পথ তৈরি হবে। জনগণের শক্তি যখন ঐক্যবদ্ধ হয়, তখনই হাসিনার মতো ফ্যাসিস্ট পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের সমস্ত প্রতিষ্ঠানে যদি জনগণের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
তিনি বলেন, প্রত্যেকটি জেলায় জেলায়, অঞ্চলে অঞ্চলে গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের তরুণ নেতৃত্ব আমরা দেখতে চাই। এটাই হবে জনগণের বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশ হবে সকলের অধিকার ও মর্যাদার বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশ হবে বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ। যারা এই বাংলাদেশ গড়ায় বাধা দেবে তাদেরকে আমাদের প্রতিহত করতে হবে।
সমাবেশে শহীদ তাহির জামান প্রিয়র মা শামসি আরা জামান বলেন, বাংলাদেশে আর কখনো কেউ ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে পারবে না, কারণ ফ্যাসিস্টকে কীভাবে তাড়াতে হয় আমরা শিখে গেছি। আমাদের সন্তানরা যে সংস্কারের জন্য জীবন দিয়েছে, সেই সংস্কারগুলো আমরা দেখতে চাই।
শহীদ জাহিদুল ইসলাম সাগরের ভাই আনোয়ারুল ইসলাম জীবন বলেন, আমরা আন্দোলন করেছি ফ্যাসিবাদের পতন ঘটানোর জন্য। কোনো দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য নয়।
শহীদ রমিজ উদ্দিনের বাবা রফিকুল আনোয়ার বলেন, শহীদ ও আহতদের একটাই দাবি, প্রত্যেকটা শহীদ ও আহতদের জন্য ন্যায়বিচার। অনেক আহতদের অভিযোগ তারা সুচিকিৎসা পাচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকার শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দাবি, শহীদের মর্যাদা ও শহীদের হত্যার বিচার, শহীদ পরিবার ও আহতদের পুনর্বাসন, আহতদের সুচিকিৎসা ও জুলাই সনদ।
শহীদ আবু সাঈদের সহযোদ্ধা ও রংপুরে গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা শাহরিয়ার সোহাগ বলেন, যদি ৫ আগস্ট না হতো তাহলে আজকে আমাদেরও মৃত্যুর এক বছর পূর্ণ হতো। আবু সাঈদের শহীদ হওয়ার পর এই আন্দোলন আর কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি হয়ে উঠেছিল ফ্যাসিবাদের পতনের আন্দোলন।
গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা ও বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সহ-সাধারণ সম্পাদক ফাতেমা রহমান বিথী বলেন, আমরা ন্যায়ভিত্তিক ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই। যত দিন পর্যন্ত জুলাই গণহত্যার বিচার, আহতদের পুনর্বাসন ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা না হবে, যত দিন শ্রমিকেরা তাদের ঘামের মজুরি না পাবে, যত দিন কৃষকেরা তাদের ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাবে, তত দিন আমাদের লড়াই চলবে। শহীদেরা এই দায়িত্ব আমাদের দিয়ে গেছেন।
বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সৈকত আরিফ বলেন, আবু সাঈদ যখন দুই হাত প্রসারিত করে শহীদের মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছিলেন, তখন শেখ হাসিনার তৈরি করা ভয়ের সাম্রাজ্য ভেঙে পড়েছিল। ফ্যাসিস্ট হাসিনার সময়ে যা কিছু অন্যায় হয়েছে সেটা যাতে আর কখনো হতে না পারে সেটা নিশ্চিত করাই হলো নতুন বন্দোবস্ত।
গণসংহতি আন্দোলনের নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল বলেন, আবু সাঈদ দুই হাত পেতে নিজের বুকে গুলি টেনে নিয়েছিলেন। তিনি হয়ে উঠেছিলেন আমাদের সাহসের প্রতীক, যে সাহস ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের মানুষের মধ্যে। তিনি বলেন, শহীদরা আজও ন্যায়বিচার পাননি, রাষ্ট্র আজও আহতদের ও শহীদ পরিবারের দায়িত্ব নেয়নি। গণঅভ্যুত্থানের সরকারকে এই দায়িত্ব নিতে হবে।
সংবিধানকে ব্যবহার করেই হাসিনা ও আওয়ামী লীগ ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল মন্তব্য করে আবু হাসান রুবেল বলেন, এক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা ও বিভাজনের রাজনীতি আর চলবে না। কেউ যদি মনে করেন, পুরানো চোরকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করে নতুন বন্দোবস্ত করবেন, সেটা চলবে না। আমরা চৌর্যবৃত্তির অবসান চাই। বাংলাদেশের শ্রমিক, কৃষক, সকল পেশা, ধর্ম, লিঙ্গ, সকল বৈচিত্রের মানুষের সমঅধিকার আমরা চাই। আমরা এমন একটা নির্বাচন চাই যেখানে কোনো কারচুপি হবে না, জোরজবরদস্তি হবে না, চুরি হবে না। তিনি বলেন, জনগণের স্বার্থের বাইরে আমাদের কোনো রাজনীতি নাই, এই রাজনীতিই আগামী দিনে জনগণের বাংলাদেশ তৈরিতে পথ দেখাবে।
গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য তাসলিমা আখতার বলেন, ৩৬শে জুলাইয়ের বিজয়ের ইতিহাস গত ১৫ বছরের বেশি সময়ের আন্দোলনের ইতিহাস। আমরা যেমন ১৯৭১-কে ধারণ করি, তেমনি ২০২৪কেও ধারণ করি।। ৭১ যেমন এদেশের শ্রমিক কৃষকসহ সমস্ত জনগণের, তেমনি চব্বিশও আমাদের সবার।
গণসংহতি আন্দোলনের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য দীপক রায় বলেন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের জন্মের পথ তৈরি করেছিল। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান আমাদের শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি মানুষের মুক্তির পথ তৈরি করেছে।
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে গণসংহতি আন্দোলন রংপুর জেলার আহবায়ক তৌহিদুর রহমান বলেন, গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে এই বাংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদী কায়দায় রাষ্ট্র চলবে না। জনগণ যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এই অভ্যুত্থান সফল করেছিল তা হলো একটা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। সেই বৈষম্যহীন দেশ তৈরির জন্য আমাদেরকে দেশের প্রতিটা মানুষের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। আর সেটা সম্ভব একটা নতুন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বন্দোবস্তের মাধ্যমে। এই নতুন বন্দোবস্তই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটাবে।
আজ দিনব্যাপী রংপুরে বিভিন্ন কর্মসূচির শুরুতে সকালে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতিবিজড়িত ক্যাম্পাস পরিদর্শন ও গণতন্ত্র মঞ্চের সমাবেশে যোগদান করেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ও নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল।
এরপর রংপুরের পীরগঞ্জে শহীদ আবু সাঈদের সমাধিতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে কবর জিয়ারত করেন দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। সেইসাথে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন গণসংহতি আন্দোলন রংপুর জেলা ও বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের নেতাকর্মীবৃন্দ। বিকালে রংপুরের পায়রা চত্বরে শহীদদের স্মরণে সমাবেশ ও মিছিল করে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন।
গণসংহতি আন্দোলন রংপুর জেলার সদস্য সচিব মুফাখখারুল ইসলাম মুনের সঞ্চালনায় শহীদ স্মরণে সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন দলের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য হাসান মারুফ রুমী, মনির উদ্দীন পাপ্পু, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য বাচ্চু ভূইয়া, জুলহাসনাইন বাবু, উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য কেরামত আলী, কেন্দ্রীয় সদস্য আলিফ দেওয়ান, রংপুর জেলার সংগঠক আব্দুল জব্বার, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সৈকত আরিফ, ঢাকা মহানগর সভাপতি আল-আমীন রহমান, টাঙ্গাইল জেলা সংগঠক ফাতেমা রহমান বিথি, রংপুর জেলার নেতা কাজল রায় অন্তু, মোঃ তানজিল, বাংলাদেশ যুব ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সম্পাদক জাহিদ সুজন, পেশাজীবী সংহতির কেন্দ্রীয় সংগঠক সাইফুল্লাহ সিদ্দিক রুমন, বাংলাদেশ আউটসোর্সিং কর্মচারী কল্যাণ পরিষদের সভাপতি মাহবুবুর রহমান আনিস, গণসংহতি আন্দোলনের রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও থানার নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় ও বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।