ঝিনাইদহ

ঝিনাইদহে প্রতিবন্ধী স্কুল খুলে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, ইউপি চেয়ারম্যান নাজিরের বিরুদ্ধে

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সাধুহাটি ইউনিয়নের ১২ মাইল এলাকায় সরকারি অনুদান ও নিবন্ধনের ভুয়া আশ্বাস দিয়ে এক প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় খুলে লাখ লাখ টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘সাধুহাটি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়’ নামের এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার আশায় বহু পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে আজ ঋণের চড়া সুদে পিষ্ট। দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিদ্যালয়টির কথিত কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নিঃস্ব ভুক্তভোগীরা এখন সুবিচারের আশায় প্রশাসনের দুয়ারে ঘুরছেন।
সরজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, তৎকালীন প্রভাবশালী চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় সাধুহাটি ইউনিয়ন আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক চেয়ারম্যান নাজির উদ্দিন এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী রাঙ্গিয়ারপোতা গ্রামের মাহবুবুর রহমান যৌথভাবে এই প্রতারণা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। বিদ্যালয়টির ভুয়া নিবন্ধন ও সরকারি বরাদ্দের প্রলোভন দেখিয়ে এলাকার নিরীহ চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় মোটা অঙ্কের টাকা।
প্রতারণার শিকার মাটিকুমড়া রাঙ্গিয়ারপোতা গ্রামের আতিয়ার রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, মেয়ে তামান্না খাতুনকে আয়া পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে নাজির চেয়ারম্যান ও মাহবুবুরের হাতে তিনি তুলে দেন নগদ ২ লাখ টাকা। কিন্তু চাকরি তো দূরের কথা, বিদ্যালয়টির কোনো অস্তিত্বই ছিল না। এখন টাকা ফেরত চাইলে আজ-কাল বলে সময়ক্ষেপণ করছেন অভিযুক্তরা।
একই গ্রামের অপর ভুক্তভোগী শফিউদ্দিনের করুণ কাহিনী আরও মর্মান্তিক। মেয়ে রিমতি খাতুনকে এই বিদ্যালয়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার আশায় তিনি আ’লীগ নেতা নাজির চেয়ারম্যান ও মাহবুবুরকে দেন ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা। শফিউদ্দিন অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমি এনজিও এবং চড়া সুদে ব্যাংক লোন নিয়ে এই টাকা দিয়েছিলাম। এখন চাকরিও হলো না, টাকাও ফেরত পাচ্ছি না। প্রতি মাসে সুদের কিস্তি টানতে টানতে আমি আজ পুরোপুরি নিঃস্ব। আমরা এই প্রতারক চক্রের কঠোর বিচার ও টাকা ফেরত চাই।”
স্থানীয় বাসিন্দা আহাদ আলী জানান, প্রতিষ্ঠার কথা শোনা গেলেও বাস্তবে এই বিদ্যালয়ে কখনো কোনো শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হতে দেখা যায়নি। দিনের পর দিন বন্ধ থাকতে থাকতে ভবনটি এখন জনমানবহীন ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে।
ভবনটির মধ্যে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পরিত্যক্ত বিদ্যালয় ভবনটি সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ভবনের কক্ষগুলোতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ব্যবহৃত কনডম, ইনজেকশনের অ্যাম্পুল, ফেনসিডিলের খালি বোতল ও গাঁজা সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় ভবনটি এখন এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে।
নিয়োগ বাণিজ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত মাহবুবুর রহমান প্রথমে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও পরবর্তীতে কৌশলে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঘুষ ছাড়া তো কোনো চাকরি হয় না! তাই চাকরি দেওয়ার কথা বলে আমরা বেশ কয়েকজন প্রার্থীর কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলাম।”
অন্যদিকে, ঘটনার বিষয়ে সাধুহাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নাজির উদ্দিনের সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি “আমি বর্তমানে ঢাকায় আছি, পরে কথা বলবো” বলে তড়িঘড়ি করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
সর্বস্ব হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটানো পরিবারগুলো অবিলম্বে এই জালিয়াতি চক্রের শাস্তি এবং আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধারে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button