ঝিনাইদহে দাফন হওয়া আফগান নাগরিকের লাশ নিতে ৫০ দিন ধরে ঘুরছেন ভাই ইমাল মোহাম্মদী!

ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তের ইছামতী নদী থেকে উদ্ধার হওয়া সুদূর আফগানিস্তানের নাগরিক হাসমত মোহাম্মদীর মরদেহ দাফনের পৌনে পাঁচ মাস পর লাশ নিতে বাংলাদেশে এসেছেন তার আরেক ভাই ইমাল মোহাম্মদী।
তিনি বাংলাদেশে ৫০ দিন ধরে অবস্থান করলেও দাপ্তরিক জটিলতায় কবর থেকে লাশ উত্তোলনের প্রক্রিয়াটি আটকে আছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সবুজ সংকেত নিয়ে নিহতের ভাই প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণসহ সুদূর আফগানিস্তান থেকে ঝিনাইদহে এসে পৌঁছালেও পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের নির্দেশনা না থাকায় দুর্ভোগে পড়েছেন পরিবারটি।
মহেশপুর থানার ওসি মেহেদী হাসান জানান, গত ১৩ এপ্রিল ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার পলিয়ানপুর সীমান্তের ইছামতী নদী থেকে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ ও বিজিবি। পিবিআই আঙুলের ছাপ নিয়ে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্রের ডেটাবেজে কোনো মিল না পাওয়ায় মরদেহটি বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে ১৪ এপ্রিল ঝিনাইদহ পৌর কেন্দ্রীয় গোরস্থানে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় মহেশপুর থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা (নং ২০, তারিখ: ১৪ এপ্রিল) দায়ের হয়।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাশের ছবি দেখে নিহতের স্বজনেরা নিশ্চিত হন যে নিহত ব্যক্তি আফগানিস্তানের কাবুলের পাঞ্জাশির এলাকার কুন্ডুস গ্রামের ইয়াসিন মোহাম্মদী ও সকিনা মোহাম্মদী দম্পতির ছেলে হাসমত মোহাম্মদী। হাসমতের মৃত্যুর পর তার লন্ডন প্রবাসি আরেক ভাই মীর ওয়াইস মোহাম্মদী লন্ডন থেকে ঝিনাইদহে আসলেও আইনি জটিলতার কারণে লাশ না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন। দাফন হওয়ার ৪ মাস ২৪ দিন পর আজ সোমবার (২৪ আগস্ট ২০২৬) নিহতের আরেক ভাই ইমাল মোহাম্মদী ভাইয়ের লাশ স্বদেশে ফিরিয়ে নিতে ডিএনএ টেস্টের নথিপত্র, মন্ত্রনালয়ের চিঠি, পরিচয়পত্র ও প্রমাণাদিসহ ঝিনাইদহে আসেন।
মৃত হাসমত মোহাম্মদীর বাংলাদেশী আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহমুদুল হাসান মাসুম জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন শাখা-১ এর উপ-সচিব কাজী আরিফুর রহমান গত ১১ আগস্ট (স্মারক নং ৮১৯) পররাষ্ট্র সচিব, ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর এক পত্রে নিহতের লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে আফগানিস্তানে পাঠাতে অনাপত্তি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের চিঠি না থাকায় ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে লাশ উত্তোলনের পক্রিয়া থেমে আছে।
অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টিতে যেহেতু একটি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিক জড়িয়ে আছেন, তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠির পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত মরদেহ উত্তোলন ও হস্তান্তর সম্ভব হচ্ছে না।
ঝিনাইদহের একটি রেষ্টুরেন্টে অবস্থানরত অশ্রুসিক্ত ভাই ইমাল মোহাম্মদী জানান, “ময়না তদন্তের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে তার ভাই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তারা শুধু চান ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মরদেহটি নিজ দেশে নিয়ে দাফন করতে। এভাবে এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘোরাঘুরি করাটা তার জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক।”
তাদের আইনজীবী মাহমুদুল হাসান মাসুম বলেন, “স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অনাপত্তিপত্র দিয়েছে। এখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফিরতি চিঠির অপেক্ষা করা হচ্ছে। আমরা আশা করছি, মানবিক দিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হবে, যেন ভুক্তভোগী পরিবারটি দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মরদেহটি দেশে ফিরিয়ে নিতে পারে।”
ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন সোমবার বিকালে জানান, “আমরা সকল ধরণের সহযোগীরতার জন্য প্রস্তুত আছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের চিঠি পেলে লাশ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।”