ইরানের ‘মোজাইক ডিফেন্সে’ নাকাল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল, কী এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে সামরিক অভিযান শুরু করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়ত ভেবেছিলেন, ভেনেজুয়েলার মতো মুহূর্তেই দেশটি হার মেনে নিবে। ইরানের জনগণ রাজপথে নেমে সরকার উৎখাত করবে। কিন্তু তার আশার আপাতত গুড়ে বালি। কারণ যুদ্ধ শুরুর প্রায় দুই সপ্তাহ পরও বীর বিক্রমে লড়ে যাচ্ছে ইরান। মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের জেরে গোটা মধ্যপ্রাচ্যই এখন রণক্ষেত্র।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতার পেছনে রয়েছে তাদের সামরিক বাহিনীর ‘মোজাইক ডিফেন্স’ নীতি। বহু বছর আগে ইরানি কৌশলবিদ মোহাম্মদ আলি জাফারি এই মতবাদ তৈরি করেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশল মূলত ‘দুই দশকের গবেষণার ফল’, যা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর পূর্ব ও পশ্চিমে হওয়া পরাজয়গুলো বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছে।
‘সরকার পতন সম্ভব নয়’, ইরান ইস্যুতে ইসরায়েলের অসহায় স্বীকারোক্তি
তিনি বলেন, ‘আমরা সেসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছি। আমাদের রাজধানীতে বোমা হামলা হলেও যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতায় তার কোনো প্রভাব পড়ে না। বিকেন্দ্রীভূত মোজাইক ডিফেন্সের কারণে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে কোনও সমস্যা হয় না।’
মোজাইক ডিফেন্সের রূপকার
ইরানের ‘মোজাইক ডিফেন্স’ ধারণার স্থপতি হিসেবে পরিচিত মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলি জাফারি নামের একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা। তিনি ২০০৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ইসলামি বিপ্লবের পর তিনি ইরানের কুর্দিস্তান প্রদেশে পরিচালিত একটি গোয়েন্দা ইউনিটের মাধ্যমে আইআরজিসিতে যোগ দেন বলে জানা যায়। পরবর্তী সময়ে বহু বছর ধরে ইরানের সামরিক নীতি পুনর্গঠনে কাজ করেন তিনি, যাতে শীর্ষ নেতৃত্ব হারালেও দেশ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে।
ইরান-ইরাক যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন জাফারি। এরপর ধীরে ধীরে তিনি আইআরজিসিতে উচ্চপদে উন্নীত হন। ১৯৯২ সালে তিনি গার্ড বাহিনীর স্থলবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হন এবং একই সঙ্গে অভিজাত ইউনিট সারাল্লাহ-এর নেতৃত্বও পান।
২০০৫ সালে তিনি আইআরজিসির সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের পরিচালক নিযুক্ত হন। সেই পদে থেকেই তিনি ‘মোজাইক ডকট্রিন’ তৈরি করেন। এতে ইরান-ইরাক যুদ্ধ এবং ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হয় বলে মার্কিন ইনস্টিটিউট অব পিসের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০০৭ সালে জাফারি আইআরজিসির প্রধান হন। এ পদে দায়িত্ব পালনকালে ‘মোজাইক ডিফেন্স’ নীতি বাস্তবায়ন করেন তিনি।
কী এই মোজাইক ডিফেন্স?
মোজাইক ডিফেন্স হলো ইরানের একটি সামরিক ধারণা, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কাঠামোকে একক কমান্ড চেইনে কেন্দ্রীভূত না রেখে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আধা-স্বাধীন স্তরে বিভক্ত করা হয়। এতে শীর্ষ নেতৃত্বে আঘাত হানলেও পুরো ব্যবস্থাকে অচল করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই কাঠামোর অধীনে আইআরজিসি, বাসিজ বাহিনী, নিয়মিত সেনা ইউনিট, ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী, নৌসম্পদ এবং স্থানীয় কমান্ড কাঠামো একটি বিস্তৃত ও বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করে। ফলে কোনো একটি অংশ আক্রান্ত হলেও অন্য অংশগুলো কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে। এমনকি শীর্ষ নেতারা নিহত হলেও কমান্ড কাঠামো ভেঙে পড়ে না।
আইআরজিসিকে ৩১টি প্রাদেশিক কমান্ডে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি প্রাদেশিক কমান্ড নিজস্ব অস্ত্র, গোয়েন্দা ব্যবস্থা এবং কমান্ড কাঠামোসহ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সামরিক ইউনিট হিসেবে কাজ করে। শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও স্থানীয় ইউনিটগুলোকে স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
ইরানি সামরিক সংস্কৃতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ড. মাইকেল কনাল বলেন, ‘এই পুনর্গঠন করা হয়েছে যাতে ‘ইরানের ডিফেন্স সিস্টেমকে দুর্বল করার যেকোনো প্রচেষ্টা অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে।’
মোজাইক ডিফেন্স অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘাতে ইরান কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। তবে
আঞ্চলিক ইউনিটগুলোকে তখনও সক্রিয় থাকতে হবে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা রাখতে হবে। এই কৌশলের অংশ হিসেবে ইরান সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠীকেও ব্যবহার করা হয়, যাদের সম্মিলিতভাবে ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ বলা হয়।
কেন এই মডেল গ্রহণ করে ইরান
২০০১ সালে আফগানিস্তানে এবং ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। বিশেষ করে সাদ্দাম হোসেনের শাসনের দ্রুত পতন ইরানের কৌশলগত চিন্তাভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলে।
এরপর থেকেই তেহরান বুঝতে পারে, পুরো সামরিক কাঠামোকে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরশীল রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তারা ধীরে ধীরে বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষা কাঠামোর দিকে ঝুঁকে পড়ে, যা পরবর্তীতে ‘মোজাইক ডিফেন্স’ নীতিতে রূপ নেয়।