ছাগলের অবৈধ হাট উচ্ছেদে গিয়ে বিপাকে ইউএনও

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ছাগলের অবৈধ হাট উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে উপজেলা প্রশাসন ও বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। নিয়মিত যানজট নিরসন অভিযানের অংশ হিসেবে অবৈধ হাট অপসারণ করতে গিয়ে বিপাকে পড়েন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও স্থানীয় বিএনপির নেতারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আগে এ হাট সাটুরিয়া মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটে বসত এবং মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা এটি নিয়ন্ত্রণ করতেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ধামরাই উপজেলার আমতা ইউনিয়নের বিএনপির কয়েকজন নেতা যুবদল নেতা রাজা মিয়ার নেতৃত্বে হাটটি সেখান থেকে সরিয়ে এনে সাটুরিয়া সরকারি স্কুলের খালি জায়গায় বসান।
এ নিয়ে তখন দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হলে সাটুরিয়া সরকারি স্কুল কর্তৃপক্ষ কুরবানির ঈদকে সামনে রেখে তিন মাসের জন্য ভাড়ার ভিত্তিতে হাট পরিচালনার অনুমতি দেয়। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও হাট কর্তৃপক্ষ সেই জায়গা থেকে হাট সরিয়ে নেয়নি। প্রায় এক বছর ধরে তারা একই স্থানে হাট পরিচালনা করে আসছে।
গত ৪ মার্চ সাটুরিয়া উপজেলা পরিষদের মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভায় আসন্ন ঈদ উপলক্ষে যানজট নিরসনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা বিএনপির নেতারা এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এর ধারাবাহিকতায় গত ৫ মার্চ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মৌমিতা গুহ এবং সাটুরিয়া থানার তদন্ত কর্মকর্তা আসাদ জামানকে নিয়ে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় যৌথ অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় রাস্তার ওপর ছাগলের হাট বসানোর কারণে তীব্র যানজট সৃষ্টি হওয়ায় হাট সরিয়ে নিতে মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি স্কুল মার্কেটের ফুটপাত দখল করে রাখা দোকানদারদেরও সতর্ক করা হয়। রাস্তায় থাকা অবৈধ পার্কিং ও হ্যালোবাইকও সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে কিছু সময় পরই বাসস্ট্যান্ড এলাকায় আবার আগের মতো যানজটের চিত্র ফিরে আসে।
ঈদ সামনে রেখে যানজটের তীব্রতা বাড়তে থাকলে বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) আবারও উপজেলা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সুশীল সমাজ ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন ইউএনও ইকবাল হোসেন। বৈঠক শেষে তিনি সরাসরি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় যানজটমুক্ত করতে অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানের সময় সেখানে আবারও ছাগলের হাট দেখতে পান তিনি। একাধিকবার সতর্ক করা হলেও হাট কর্তৃপক্ষ তা সরাতে রাজি হয়নি। তারা দাবি করেন, ধামরাই উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে তারা এ হাটের ইজারা নিয়েছেন।
এক পর্যায়ে হাট পরিচালনাকারীদের মধ্যে আমতা ইউনিয়ন বিএনপির নেতা রাজা মিয়া সাটুরিয়ার ইউএনওকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি কে? এটি ধামরাই থানা। এখানে ধামরাইয়ের এমপি তমিজ উদ্দিন সাহেব আপনাকে ফোন দেবেন।’
এ সময় তিনি সাটুরিয়ার বিএনপি নেতাদের উদ্দেশ করেও বলেন, ‘আপনারা এখানে কেন এসেছেন? এটা ধামরাই থানা, আপনারা এখানে আসতে পারেন না।’
পরবর্তীতে ইউএনও ইকবাল হোসেন হাটের বৈধ কাগজপত্র দেখতে চাইলে হাট কর্তৃপক্ষ তা দেখাতে ব্যর্থ হয়। পরে সাটুরিয়া সরকারি স্কুলের জায়গায় অনুমতি ছাড়া হাট বসানোর দায়ে তাদের ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং সেখান থেকে হাট অপসারণ করে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে স্কুল মার্কেটের দোকানদাররা জানান, প্রায় এক বছর ধরে তারা এই হাটের দুর্গন্ধ সহ্য করে আসছেন। প্রতিদিন সকালে শত শত ছাগল এখানে আনা হয়, যার মলমূত্রের দুর্গন্ধে এলাকায় থাকা দায় হয়ে পড়ে। এখানে খাবারের দোকান ও ওষুধের দোকান রয়েছে। এই পরিবেশে রোগজীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। আমরা এই হাট থেকে মুক্তি চাই।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ধামরাই উপজেলার আমতা ইউনিয়নের নান্দেশ্বরী মৌজার নকশায় একটি গো-হাটের উল্লেখ রয়েছে। তবে বর্তমানে সেই জায়গা অন্যদের দখলে রয়েছে এবং সেখানে পাকা ও বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ধামরাই উপজেলা প্রশাসন সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়াই নকশা অনুযায়ী দরপত্র আহ্বান করে। এতে আমতা ইউনিয়নের বিএনপি নেতারা হাটের ইজারা নেন। কিন্তু নির্ধারিত জায়গা না পেয়ে তারা একপর্যায়ে সাটুরিয়া স্কুলের মার্কেটের জায়গা ও রাস্তা দখল করে হাট পরিচালনা শুরু করেন।
হাট পরিচালনাকারী বিএনপি নেতাদের দাবি, ধামরাই উপজেলা প্রশাসন তাদের হাটের ইজারা দিয়েছে এবং তারা বৈধভাবেই হাট পরিচালনা করছেন। তারা অভিযোগ করেন, সাটুরিয়ার ইউএনও অবৈধভাবে তাদের জরিমানা করেছেন।
সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন বলেন, তারা অবৈধভাবে সাটুরিয়া সরকারি স্কুলের জায়গা দখল করে হাট বসিয়েছিল এবং সাটুরিয়া নাম ব্যবহার করে রসিদ দিচ্ছিল। এতে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় তীব্র যানজট ও পরিবেশ দূষণ সৃষ্টি হচ্ছিল। তাই তাদের জরিমানা করা হয়েছে এবং অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল মামুন বলেন, আমি মাত্র তিন দিন আগে এখানে যোগদান করেছি। বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানি না। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।