সারাদেশ

‘শুনেছি যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে, তাই ট্যাংক ফুল করতে এলাম’

‘শুনেছি যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে, তাই ট্যাংক ফুল করতে এলাম’, চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার এলাকার কিউসি ট্রেডিং লিমিটেড ফিলিং স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে এ কথাই বলছিলেন অ্যাম্বুলেন্সচালক মোহাম্মদ মামুন।

আজ শুক্রবার বেলা তিনটার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ছুটির দিনেও ফিলিং স্টেশনটির প্রায় আধা কিলোমিটারজুড়ে লম্বা সারি। মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, ছোট যানবাহন—সব মিলিয়ে ভিড়। সেই ভিড়ে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন মামুন। এক ফাঁকে প্রথম আলোকে বলেন, ‘তেল নিয়ে নানা ধরনের খবর শুনছি। এখন তেল পাওয়া যাচ্ছে। তাই তেল কিনে রাখছি। না হলে পরবর্তী সময়ে গাড়ির চাকা ঘুরবে না।’

বিজ্ঞাপন
Jhenada TV Logo
/JhenadaTV

সর্বশেষ আপডেট পেতে

🔴 সাবস্ক্রাইব করুন

কিউসি ট্রেডিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেছে, ভিড়ের বড় অংশই আতঙ্কগ্রস্ত। যাঁরা লাইনে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের অনেকেই নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না কোথা থেকে জ্বালানিসংকটের খবর শুনেছেন। তবে চারদিকে ‘তেল আসছে না’, ‘যুদ্ধের কারণে জাহাজ আটকে গেছে’, ‘ফিলিং স্টেশন শুকিয়ে যাবে’, এমন কথাবার্তা ছড়িয়ে পড়ায় বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি করছে।

মোটরসাইকেলচালক আবদুল হান্নান প্রায় এক ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বেলা তিনটার দিকেও তিনি তেল পাননি। তাঁর সামনে তখনো ৩০ থেকে ৪০ জন অপেক্ষা করছিলেন। তিনি বলেন, তেলের সংকট হলে তাঁর সংসারই অচল হয়ে যাবে। কারণ, মোটরসাইকেল চালিয়েই তিনি প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করেন। তাই তেল নিতে এসেছেন আগেভাগে।

দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট এই মুহূর্তে নেই। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ঘিরে কিছু মানুষ আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনে রাখছেন, তবে এর কোনো প্রয়োজন নেই। দেশে তেলের মজুত এখনো ফুরিয়ে যায়নি। তেলবাহী ৫টি জাহাজ আগামী সপ্তাহের মধ্যেই দেশে পৌঁছাবে। ফলে সরবরাহে ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা নেই।

—অনিন্দ্য ইসলাম, প্রতিমন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়

কিউসি ট্রেডিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপক মীর খানও একই ধরনের চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, স্বাভাবিক সময়ে তাঁদের স্টেশনে দিনে ৮ থেকে ৯ হাজার লিটার অকটেন বিক্রি হয়। কিন্তু দুই দিন ধরে বিক্রি বেড়ে ২০ থেকে ২১ হাজার লিটারে পৌঁছেছে; অর্থাৎ বিক্রি প্রায় দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। তাঁর মতে, এই চাহিদা স্বাভাবিক নয়; মানুষ আতঙ্কে তেল কিনে রাখছেন। তবে বিপিসি থেকে তাঁদের জানানো হয়েছে, জ্বালানি তেলের কোনো তাৎক্ষণিক সংকট নেই।

চট্টগ্রামের ফিলিং স্টেশনগুলোর চিত্র বলছে, এটি শুধু একটি স্টেশনের ঘটনা নয়, নগরের প্রবর্তক এলাকার আলহাজ ফয়েজ আহমদ অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনেও তিন দিন ধরে ভিড় বেড়েছে। সেখানে এলপিজি, ডিজেল ও অকটেন বিক্রি হয়। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মো. আমজাদ হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, গত বৃহস্পতিবার তাঁদের স্টেশনে ৭ হাজার লিটার অকটেন বিক্রি হয়েছে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে ৪ থেকে ৫ হাজার লিটারের বেশি বিক্রি হয় না। ডিজেলের বিক্রিও ৩ হাজার লিটার বেড়ে ৫ হাজার লিটারে উঠেছে। এলপিজির বিক্রি অবশ্য এখনো স্থিতিশীল রয়েছে।

নগরের ষোলশহর এলাকার ফসিল ফিলিং স্টেশনেও আজ বেলা দুইটার দিকে সারি দেখা গেছে। সেখানে অপেক্ষমাণ গাড়ি ও মোটরসাইকেলের সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো। কয়েকজন কর্মচারী জানান, সকালে তেমন চাপ ছিল না। দুপুরের পর কিছুটা বিক্রি বেড়েছে। নিয়মিত গ্রাহকের বাইরে নতুন অনেকেই এসে ট্যাংক ভরে নিচ্ছেন।

জ্বালানি খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক সংকটের সময় বাজারে বাস্তব সরবরাহের পাশাপাশি আরেকটি বড় বিষয় কাজ করে—মনস্তাত্ত্বিক চাপ। মানুষ যখন ধরে নেয়, সামনে জ্বালানি পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে, তখন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কেনার প্রবণতা তৈরি হয়। এতে স্বল্প সময়ে ফিলিং স্টেশনগুলোর ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকলেও খুচরা পর্যায়ে অস্থিরতা তৈরি হয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালায়। এর পর থেকে ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধ। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় জ্বালানি তেল নিয়ে সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের কয়েকটি জাহাজের সূচি পিছিয়ে গেছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বিপিসি বলছে, জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। দেশে জ্বালানি তেলের মজুত এখনো ফুরিয়ে যায়নি।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম আজ বেলা তিনটার দিকে প্রথম আলোকে বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট এই মুহূর্তে নেই। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ঘিরে কিছু মানুষ আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনে রাখছেন, তবে এর কোনো প্রয়োজন নেই। দেশে তেলের মজুত এখনো ফুরিয়ে যায়নি। তেলবাহী ৫টি জাহাজ আগামী সপ্তাহের মধ্যেই দেশে পৌঁছাবে। ফলে সরবরাহে ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনে বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি তেল আমদানি করা হবে। তাই অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সবাইকে স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি ব্যবহারের আহ্বান জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button