ফিচার

অগ্নিযুগের শেষ বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী

Advertisements

এখন আর যাই থাক বা না থাক দ্রোহ বা বিপ্লব বলে কিছু নেই। শুধু বাংলাদেশে নয়, দুনিয়া থেকেই এই প্রক্রিয়া বা মানুষের ত্যাগের ইতিহাস বিলুপ্ত প্রায়। আমাদের যৌবন পর্যন্ত আমরা জানতাম যাঁরা দেশ ও মানুষকে ভালোবেসে আত্মদান করেন তাঁরা অমর।

আমি চট্টগ্রাম শহরে জন্ম নিয়েছি। আমাদের এই গৌরবদীপ্ত শহরকে দুনিয়া তথা উপমহাদেশ চেনে বিপ্লবী সূর্য সেনের নামে। ব্রিটিশ ভারতে অকুতোভয় সূর্য সেন পরিচিত ছিলেন মাস্টারদা নামে। মাস্টার দা ও তাঁর সুযোগ্য শিষ্য প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা যোশীকে চেনে না এমন মানুষ বিরল। এই দলের বিপ্লব বা স্বাধীনতা স্পৃহা শেষতক সার্থক না হলেও তাঁদের প্রাণের বিনিময়েই একসময় ভারতবর্ষ ইংরেজ মুক্ত হওয়ার পথে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল। এই বিপ্লবী দলের কনিষ্ঠতম সদস্য ছিলেন বিনোদ বিহারী।

জন্ম ১৯১১ সালের ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার উত্তর ভূর্ষি গ্রামে। ১৯২৯ সালে সারোয়াতলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পাস করেন। লাভ করেন রায় বাহাদুর বৃত্তি। স্কুল জীবনেই বিপ্লবী যুগান্তর দলের সঙ্গে যুক্ত হন। এ সময় তিনি সংস্পর্শে আসেন মাস্টারদা সূর্য সেনের এবং সূর্যসেনের নেতৃত্বে বিভিন্ন বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। ১৯৩০ সালে চট্টগ্রামের জালালাবাদ পাহাড়ে মাস্টারদার বিপ্লবী বাহিনী ও ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধে অনেক বীর বিপ্লবী শহীদ হন। বিনোদ বিহারীর কণ্ঠনালীতে গুলি লাগে। গোপনে তাঁকে চিকিৎসা নিতে হয়। ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। এরপর পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। ভারতের রাজপুতনা দেউলি ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দী অবস্থায় ১৯৩৪ সালে প্রথম বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ১৯৩৬ সালে ডিস্টিংশনসহ বিএ পাস করেন। ইংরেজ সরকার কর্তৃক গৃহবন্দী অবস্থায় ১৯৩৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এমএ ও বিএল পাস করেন।

বিজ্ঞাপন
Jhenada TV Logo
/JhenadaTV

সর্বশেষ আপডেট পেতে

🔴 সাবস্ক্রাইব করুন

সে বছর গৃহবন্দীত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত ‘পাঞ্চজন্য’ পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। পাশাপাশি চট্টগ্রাম আদালতে আইন পেশায় যুক্ত হন এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দিয়ে শুরু করেন সক্রিয় রাজনীতি চর্চা। ১৯৪১ সালে আবার তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। মুক্তি পান পঁয়তাল্লিশের শেষ দিকে। বন্দী থাকাকালীন বিনোদ বিহারী বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন। ছেচল্লিশে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ব্রিটিশ, পাকিস্তান, বাংলাদেশ—এই তিন পর্বে যত অন্যায়, অপশাসন ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড ঘটেছে সবটাতেই তিনি ছিলেন প্রতিবাদে সোচ্চার, লড়াকু সৈনিক।

ছেলেবেলা থেকেই তাঁকে চিনতাম। কিন্তু তাঁর জীবন বা কর্মের গুরুত্ব বোঝার মতো মেধা ছিল না তখন। আমার সৌভাগ্য যে, আমি তাঁদের বাড়িতে গিয়ে তাঁর অনুজের কাছে ইংরেজির পাঠ নিতাম। পান বাহার এলাচ ও মসলার সুগন্ধি মৌ মৌ বাড়িটি এখন আর নেই। তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন ২০১৩ সালের ১০ এপ্রিল। তিনি বা তাঁর অনুজ, কেউ নেই। কিন্তু স্মৃতিময় তাদের বাড়ির সে গলি ভরে আছে তাঁদের পদচারণার মুখরিত অতীতে। তখন না বুঝলেও পরে জেনেছিলাম তারুণ্যে স্বদেশপ্রেম আর পরাধীন দেশমাতাকে মুক্ত করার জন্য তিনি জীবন উৎসর্গে রাজি এক বিপ্লবী ছিলেন, যাঁর বেঁচে থাকারই কথা ছিল না। অল্প বয়সে কালাপানিতে দেশান্তরী এই মানুষটিকে সব সময় সাধারণ ধুতি-পাঞ্জাবি ছাড়া কিছুই পরতে দেখিনি। শারীরিক কাঠামোয় মিল ছিল আমার সঙ্গে। ছিপছিপে মানুষ কিন্তু বুকভরা সাহস ও চেতনা। পরে বুঝতে পেরেছিলাম তাঁর সাহস আর দেশপ্রেম জন্ম নিয়েছিল যৌবনের শুরুতে। বলতে গেলে যৌবন শুরুর আগেই তিনি জেনে গিয়েছিলেন, ‘নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই’।

তিনি কেমন সাহসী ছিলেন একটু খুলে বলি। চট্টগ্রামের প্রাক্তন মেয়র এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরী একসময় বিতর্কে জড়িয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে। এই জটিলতার কারণ অনেক। আমি বলব রাজনীতি এমনই। সে কাউকে ছাড় দেয় না। পাওয়ার গেমে কত কিছু যে ঘটে তা জানা না থাকলে বোঝা মুশকিল। দুবার মেয়র হওয়ার পর প্রয়াত মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী তাঁকে কাবু করতে না পেরে ভিখারি বলে গালি দিয়েছিলেন। তাঁর অপরাধ ছিল চট্টগ্রাম শহরের ঐতিহ্যবাহী একটি বালিকা বিদ্যালয়ে দোকানপাট বসানোর বিরোধিতা। কিন্তু তিনি তো দমার পাত্র ছিলেন না। তাঁর দেহে ছিল বিপ্লবীর রক্তস্রোত। যিনি ব্রিটিশ শাসনে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসেছিলেন তিনি কেন ভয় পাবেন? তাঁকে অবজ্ঞা করে বা উপহাস করে ভিখারি আখ্যা দেওয়ার পরিণতি ভালো হয়নি। যদিও আওয়ামী লীগ ঢাকা থেকে আসাদুজ্জামান নূরকে পাঠিয়ে সমঝোতা ও সম্মানের পথ তৈরি করে দিয়েছিল। কিন্তু তারপরও মেয়রের শেষ রক্ষা হয়নি। সে যাত্রায় লাখো ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন চৌধুরী সাহেব। এমনই নেপথ্যের শক্তিধর মানুষটিকে বিয়ের পর থেকে দাদু বলে ডাকতাম। তিনি আমার স্ত্রী দীপাদের বাড়ির পাশের মানুষ এবং তাদের স্বজন।

Advertisements

গিয়েছিলাম তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। তখন তাঁর বয়স এক শ। ঘরে ঢুকে প্রণাম করে জানতে চেয়েছিলাম, চিনতে পেরেছেন কি না। তাকিয়ে মুখ নামিয়ে নিলেন। জবাব দিলেন, ‘তোমার কাকুর কাছে ঠিকানা চেয়েছিলাম সিডনিতে চিঠি লিখব বলে। দেয়নি।’ দীপা প্রণাম করার পর বললাম, ‘দাদু ওকে চিনতে পেরেছেন?’ এবারও সরাসরি কোনো উত্তর দিলেন না। ওর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমার বাবা কলকাতা যাওয়ার আগে দেখা করার কথা। কিন্তু করেনি।’ এমনই তাঁর প্রখর স্মৃতিশক্তি। কী টনটনে!

আমার মা তখন নার্সিং হোমে। গুরুতর অসুস্থ মায়ের কথা শুনে শূন্যে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘যাওয়ার মানুষকে যেতে দেওয়াই ভালো।’ এর এক সপ্তাহ পরে মা পৃথিবী ছেড়ে গিয়েছিলেন।

এখন দেশে টাকার ছড়াছড়ি। মানুষের হাতে প্রচুর টাকা। দেদারসে খরচও করে মানুষ। কিন্তু জৌলুশ আর ভোগের কাছে তলিয়ে গেছে আদর্শ। ডুবুডুবু নৈতিকতা। কোনোক্রমে বেঁচে আছে সংস্কৃতি। ধুঁকছে মানুষের বিশ্বাস। খালি আর্থিক উন্নতি যে সবকিছু নয়, তা এখন প্রকাশ্য। অথচ কথা ছিল দেশের আর্থিক উন্নয়নের সঙ্গেই এগোবে দেশের সমাজ। যেসব কারণে হয়নি তার একটি বিপ্লবী ত্যাগী মানুষদের কথা মনে না রাখা। তাঁদের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের দূরত্ব। যেসব কারণে সাম্প্রদায়িকতা, হিংসা, নৈরাজ্য ও অশ্লীলতা এখন সর্বগ্রাসী। মুক্তির উপায় আমাদের অজানা নয়।

যে বিপ্লবীর কথা বলছি তিনিও এমন একজন যাঁকে স্মরণ করে পার পাওয়া সম্ভব। অথচ আজীবন যিনি ত্যাগ আর সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন। তাঁর স্মৃতি কতটা আগলে রেখেছি আমরা? চট্টগ্রামের প্রশাসন কি আসলেই কিছু করেছেন এ নিয়ে?

কে কার জন্য কী করলো, তা ভেবে চলে না ইতিহাস। নিজস্ব গতিতে চলা সময়ে চট্টগ্রামের শেষ বিপ্লবী বিনোদ বিহারি চৌধুরী চিরকাল তাঁর জায়গায় থাকবেন। তাঁর অবদান লেখা থাকবে ইতিহাসের পাতায় পাতায়। আমার সৌভাগ্য যে, আমিও জন্মেছি তাঁর জন্মদিনে। এই দ্বিগুণ আনন্দের অফুরন্ত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানাই ‘বিবিসি’ নামে খ্যাত দাদুকে। শুভ জন্মদিন।

লেখক: অজয় দাশগুপ্ত, অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী কলামিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

সব তথ্য এক ক্লিকে – আপনার জানার একমাত্র ঠিকানা!

দেশ-বিদেশের আপডেট, দরকারি তথ্য, সরকারি-বেসরকারি সেবা, প্রযুক্তির খবর কিংবা লাইফস্টাইল — এক জায়গায়, এক ক্লিকে!

এখনই ভিজিট করুন