কুমিল্লার মুরাদনগরে ট্রিপল মার্ডার ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা

কুমিল্লার মুরাদনগরে আলোচিত ট্রিপল মার্ডার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ স্থানীয় বিএনপি ও উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের অনুসারীদের মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। এ ঘটনায় এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দোষারোপ করে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চালাচ্ছে পাল্টাপাল্টি প্রচার-প্রচারণা। যা নিয়ে নতুন করে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।
গত ৩ জুলাই মুরাদনগরের বাঙ্গুরা বাজার এলাকায় মাদক চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে একই পরিবারের তিনজনকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী ছিলেন ঘটনার শিকার পরিবারের সদস্য রিক্তা আক্তার। তার সামনেই একে একে কুপিয়ে ও পাথর দিয়ে থেঁতলে হত্যা করা হয় তার মা রুবি আক্তার, ভাই রাসেল ও বোন জোনাকিকে।
পরে আজ মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) দেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রিক্তা আক্তার দাবি করেন, হত্যা মামলার মূল আসামি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এবং ইউপি চেয়ারম্যান শিমুল বিল্লাহসহ অন্যান্য আসামিরা রয়েছেন স্থানীয় সরকার ও যুব উন্নয়ন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বাবার আশ্রয়ে। এ কারণেই পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করছে না।
একই অভিযোগ করেন রিক্তা আক্তারের ভাবী মীম আক্তারও।
এ বিষয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। তবে টেলিভিশনটির প্রতিবেদনে রিক্তা আক্তারের দেওয়া বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে নিহত জোনাকির স্বামী মনির বলেন, ‘পরিবারের ৩ সদস্যকে হারিয়ে রিক্তা এখন পাগলপ্রায়। একজন উপদেষ্টাকে জড়িয়ে যা নয়, তা রিপোর্ট করেছে একটি টেলিভিশন। সেখানে রিক্তা উল্টাপাল্টা বক্তব্য দিয়েছে। মূলত কায়কোবাদের লোকেদের শেল্টারে ঘটনার তিনদিন পর রিক্তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উপদেষ্টার নাম বলেছে। অথচ প্রথম সাক্ষাতকারে রিক্তা এসব কিছুই বলেনি।’
এদিকে প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি টেলিভিশনটির ওই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য নিয়ে অভিযোগ তোলেন।
স্ট্যাটাসে আসিফ মাহমুদ লিখেছেন, ‘মুরাদনগরে ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের ভাই শাহ জুন্নুন বুশরী। এমনকি এই ঘটনা ঘটার পর তাকে সোশ্যাল মিডিয়ায়ও উল্লাসে মেতে উঠতে দেখা যায়। সেখানেও আমার নাম জড়ানো হলো। অথচ গত তিনমাস ধরে আমি বা আমার পরিবারের কেউ এলাকায়ই যায় না। ভিকটিম প্রথমদিকের কোনো সাক্ষাৎকারে (আর্কাইভ আছে) আমাদের কথা বলেনি। কায়কোবাদ সাহেবের লোকেরা তাকে কনভিন্স করে একমাস পর এসব বলাচ্ছে।’
উপদেষ্টা লিখেছেন, ‘কোর্টের মারপ্যাচে এবং সরকারি সিদ্ধান্তে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও মেয়র হতে না পেরে ইশরাক ভাইও কায়কোবাদ সাহেবের সঙ্গে জোট বেঁধে তার দখলকৃত টিভি দিয়ে এসব প্রোপাগান্ডা ছড়ানোতে নেমেছে। সেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যা মামলার এক আসামিকে নিয়ে এসে ভিকটিম হিসেবে উত্থাপন করা হচ্ছে, সেলুকাস।’
আসিফ মাহমুদ লিখেছেন, ‘এই মাফিয়া, সন্ত্রাসী এস্টাবলিশমেন্টের কাছে আমরা অসহায়। মুরাদনগরে আমি এমপি ইলেকশন করতে পারি এই এক অজানা ভয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কায়কোবাদ পরিবার। দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়িত এলাকার মানুষকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছি। এলাকা থেকে এমপি হওয়ার কোনো খায়েশ নেই আমার। নিজের সক্ষমতার মধ্যে শুধু মানুষের জন্য কাজ করতে চেয়েছি, তাও করা সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। মাফিয়াদের জয়জয়কারই চলুক। কিন্তু তা করতে গিয়ে একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান (যার না আছে এস্টাবলিশমেন্টের ব্যাকআপ, না আছে ফাইনানশিয়াল ব্যাকআপ) মহা ক্ষমতাশালীদের শত্রু বানিয়েছি।’
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ আরও লিখেছেন, ‘মিডিয়া দখলে থাকলে কি না করা যায়? থানা ভাঙচুর করা, জুলাইয়ের হত্যার আসামিরা, মার্ডার করে উল্লাসকারীরা এখন ভিকটিম আর আসিফ মাহমুদ ভিলেন।’
টেলিভিশনে প্রতিবেদন প্রকাশ ও উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের এই স্ট্যাটাসের পর মুরাদনগরে বিএনপি নেতা কায়কোবাদের অনুসারী এবং উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের অনুসারীদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এমন অবস্থায় যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় পুলিশ অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছে বলে জানা গেছে।
এর আগে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সোমবার (২৮ জুলাই) উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শাহ আলম সরকারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
জেলা ডিবি পুলিশ গণমাধ্যমকে জানায়, গত ৩ জুলাই মুরাদনগর উপজেলার কড়ইবাড়ী এলাকায় আলোচিত ট্রিপল মার্ডার মামলায় বিএনপি নেতা শাহ আলম সরকারের সম্পৃক্ততা খুঁজে পাওয়া গেছে। রিমান্ডে অন্যান্য আসামিদের কাছ থেকেও ওই বিএনপি নেতার নাম এসেছে। প্রাথমিক তদন্ত ও নানা দিক বিশ্লেষণ করেই শাহ আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিএনপি নেতাকে গ্রেপ্তার পুরো ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
উল্লেখ্য, ৩ জুলাই সকালে মুরাদনগর উপজেলার আকুবপুর ইউনিয়নের কড়ইবাড়ি গ্রামে মাদক কারবারের অভিযোগে অভিযুক্ত রোকসানা আক্তার রুবির বাড়িতে হামলা চালানো হয়। হামলায় রুবি, তার ছেলে রাসেল ও মেয়ে জোনাকি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এ সময় তার আরেক মেয়ে রুমা আক্তার গুরুতর আহত হন, তিনি এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
পরদিন নিহত রুবির মেয়ে রিক্তা আক্তার বাদী হয়ে আকুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শিমুল বিল্লাহ শিমুলসহ ৩৮ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতনামা আরও ২৫ জনকে আসামি করে থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে র্যাব ও সেনাবাহিনী যৌথ অভিযান চালিয়ে আটজনকে গ্রেপ্তার করে।